;

গোপন ড্রোনের নিশানায় অপরাধীরা

গোপন ড্রোনের নিশানায় অপরাধীরা

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এবং আসন্ন বড় ছুটির সময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আকাশপথে গোপন ড্রোন নজরদারি থেকে শুরু করে আইপি ক্যামেরা ব্যবহার পর্যন্ত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে পুলিশের। পাশাপাশি ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম দেখা দিলে জিরো টলারেন্স নীতিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ৮ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করা, সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপদ ও যানজটমুক্ত চলাচল বজায় রাখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈদকে কেন্দ্র করে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও মাঠে নামানো হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হবে এবং টাকা পরিবহনে প্রয়োজন অনুযায়ী মানি এসকর্ট দেওয়া হবে। এছাড়া জাল টাকার বিস্তার রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঈদের ছুটিতে কূটনৈতিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বড় শহর ও বন্দরগুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো হবে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়ও পুলিশের দৃশ্যমান টহল জোরদার করা হবে, যাতে চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়।

গোপন ড্রোনের নজরদারি

এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অন্যতম বিশেষ দিক হলো গোপন বা ইনভিজিবল ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার। জনাকীর্ণ এলাকা, বড় বাস টার্মিনাল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব ড্রোন মোতায়েন করা হবে। সাধারণ ড্রোনের শব্দ বা উপস্থিতি অনেক সময় অপরাধীদের সতর্ক করে দেয়। কিন্তু এই বিশেষ ড্রোনগুলো অনেক উচ্চতা থেকে নীরবে হাই-রেজল্যুশন ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে পারে, যা সরাসরি পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

এর মাধ্যমে পকেটমার, ছিনতাইকারী কিংবা নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হবে। ভিড়ের মধ্যে সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করা গেলে নিকটস্থ টহল পুলিশকে সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পাঠানো হবে, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইপি ক্যামেরা

সড়ক ও মহাসড়কের ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাই-ডেফিনিশন আইপি ক্যামেরা স্থাপন করে যান চলাচল মনিটরিং করা হবে। ঈদের আগে ও পরে এসব স্থানে বিশেষ নজরদারি থাকবে। যানজটপ্রবণ এলাকাসহ বড় সেতুগুলোতে অতিরিক্ত রেকার প্রস্তুত রাখা হবে, যাতে কোনো যানবাহন বিকল হয়ে পড়লে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়। টোল প্লাজাগুলোতেও দ্রুত টোল আদায়ের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।

পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা

ফেরিঘাট, লঞ্চ টার্মিনাল, বাস টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে। মহানগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতেও বিশেষ নজরদারি থাকবে। পর্যটন কেন্দ্র, বিনোদন পার্ক এবং শপিং মলগুলোতে সাদা পোশাকধারী পুলিশ মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন টার্মিনালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধ

জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক ও মাহিন্দ্রের মতো যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে। নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো যানবাহন থামানো যাবে না এবং নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করালে সঙ্গে সঙ্গে মামলা করা হবে। লঞ্চ ও বাসে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করলেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেতন-বোনাস পরিশোধে নজরদারি

ঈদের আগে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বেতন বা বোনাস দিতে সমস্যায় পড়লে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ঈদের আগে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই না করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের ছুটি সীমিত

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সদস্যদের ছুটি সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ জরুরি বা মানবিক কারণ ছাড়া কেউ ছুটিতে যেতে পারবেন না। অতিরিক্ত প্রায় ৩০ শতাংশ জনবল মাঠে মোতায়েন থাকবে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি জোনে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা শাখার সদস্যরাও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ছদ্মবেশে বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে অবস্থান করবেন, যাতে যেকোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করা যায়।